শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২০, ০৯:০১ পূর্বাহ্ন

মঙ্গলের পথে মুসলিম বিশ্বের প্রথম নভোযান ‘হোপ’

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
  • প্রকাশিত: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২০
মঙ্গলের পথে মুসলিম বিশ্বের প্রথম নভোযান 'হোপ'

দীর্ঘ দিনের ক্ষণ গণনা শেষে অবশেষে মঙ্গলের পথে যাত্রা শুরু করেছে মুসলিম বিশ্বের প্রথম নভোযান। সফলভাবে যাত্রা শুরু করা আরব আমিরাতের এই মঙ্গল অভিযানের নাম “হোপ”। গত সপ্তাহে দুই দফা উৎক্ষেপণের ঘোষণা দেয়া হলেও আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় মঙ্গল অভিযানের নির্ধারিত সময় থেকে সরে আসতে হয় সংযুক্ত আরব আমিরাতকে।

অবশেষে সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ২০ জুলাই স্থানীয় সময় ৬টা ৫৮ মিনিটে জাপানের তেনিগাশিমা স্পেস সেন্টার থেকে মুসলিম বিশ্বের ইতিহাস হয়ে এইচ২-এ রকেটে করে মঙ্গল গ্রহের দিকে যাত্রা শুরু করেছে হোপ। ৫০ কোটি কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এটি পৌঁছবে মঙ্গলে; তারপর লাল এই গ্রহটির আবহাওয়া ও জলবায়ু বিশ্লেষণ গবেষণা এগিয়ে নিতে তথ্য পাঠাবে পৃথিবীতে। সংযুক্ত আরব আমিরাত মঙ্গলগ্রহে যে স্যাটেলাইটটি পাঠাচ্ছে, সেটির ওজন ১ দশমিক ৩ টন। জাপানের দুর্গম তানেগাশিমা মহাকাশ বন্দর থেকে রকেটের মাধ্যমে এটি উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। প্রায় ৫০০ মিলিয়ন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এই রোবটিক মহাকাশযানটি ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার গন্তব্যে পৌঁছাবে। ঐ একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত তার ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করবে বলে কথা রয়েছে।

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ৫০ বছর পূর্তিতে এটি মঙ্গলে পৌঁছবে। রকেটটির সফল উৎক্ষেপণ দেখে উচ্ছ্বাসিত আরব আমিরাতের উন্নত প্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও এই হোপ মিশনের লিড বৈজ্ঞানিক সারাহ আল আমিরি। অনুভূতি-উত্তেজনা প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, এটা আমার দেশের নাগরিকদের তেমন অনুভূতি যেমনটা ৫১ বছর আগে ঠিক এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপোলো-১১ মিশন চন্দ্রে পৌঁছার পর সেখানকার নাগরিকদের হয়েছিল।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মকে বড় বড় নতুন স্বপ্ন দেখার দুয়ার খুলে দিল আরব আমিরাতে এই মঙ্গল অভিযান। ‘আজ আমি সত্যি খুবই আনন্দিত যে আরব আমিরাতের শিশুরাও নতুন বাস্তবতা, নতুন সম্ভাবনার পথে তাদের যাত্রা দেখল।’ আর আরব আমিরাতের নতুন এই পৃষ্ঠা পৃথিবীর মঙ্গল অধ্যায়ে অনেক বড় ভূমিকা রাখবে বলেও আশার কথা জানান তিনি।

আরও পড়ুনঃ সর্বশেষ স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করবে ওমান

এর আগে মঙ্গলে যেসব অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে সেখানে প্রাধান্য পেয়েছে ভূতাত্ত্বিক গবেষণা। তবে, হোপকে পাঠানো হচ্ছে মঙ্গলের জলবায়ু নিয়ে বিশদ গবেষণা করার লক্ষ্যে। ৬ বছর ধরে হোপকে প্রস্তুত করা হচ্ছে। আরব বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে এই অভিযান সম্পর্কে আরব আমিরাতের প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ও মঙ্গল অভিযান হোপ’র উপ-প্রকল্প ব্যবস্থাপক সারাহ আল আমিরি গত জুনে এক ভার্চুয়াল সেমিনারে বলেছিলেন, এই অভিযানে বিশাল চ্যালেঞ্জ আছে। তবে, এই চ্যালেঞ্জ এমন যা অর্জন করা সম্ভব বা উৎরানো যায়। এই অভিযান বিদ্যমান প্রযুক্তি চত্বরে মানিয়ে চলার পাশাপাশি দেশের প্রযুক্তি প্রকৌশলীদের নতুন করে সক্ষমতা বাড়াবে। এর ফলে স্পেসক্রাফট বিষয়ক আরও দক্ষ প্রকৌশলী তৈরি হবে যারা আরব আমিরাতের অর্থনীতির বিভিন্ন শাখায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও ওই সেমিনারে জানিয়েছিলেন সারাহ।

সারাহ আল-আমিরি: আমিরাতের মহাকাশ অভিযানের রূপকার

সারাহ আল-আমিরি: আমিরাতের মহাকাশ অভিযানের রূপকার

কে এই সারাহ আল-আমিরি?
১৯৮৭ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে তার জন্ম। বয়স মাত্র ৩২। কিন্তু মহাকাশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিলেন একেবারে ছোটবেলা থেকে। বিবিসির আরবী বিভাগকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বর্ণনা করেছেন তার শৈশবের সেই স্বপ্নের কথা। তখন তার বয়স ছিল মাত্র নয় বছর। “আমার স্বপ্ন ছিল মহাকাশ থেকে আমি পৃথিবীকে দেখবো। কিন্তু আমাকে সব সময় শুনতে হতো এটা অসম্ভব। বিশেষ করে আপনি যদি এমন একটা দেশে থাকেন, যে দেশটা একেবারেই নতুন‍।”

“আমি যখন বলতাম আমি মহাকাশ নিয়ে কাজ করতে চাই, তখন লোকে ভাবতো আমি বুঝি কোন কল্পজগতে বাস করি,” বলছিলেন তিনি। সারাহ আল-আমিরি পড়াশোনা করেছেন কম্পিউটার সায়েন্সে, আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব শারজাহতে। তার বরাবরই আগ্রহ ছিল এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার। কিন্তু তখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোন মহাকাশ কর্মসূচীই ছিল না।

পড়াশোনা শেষে তিনি যোগ দেন এমিরেটস ইনস্টিটিউশন ফর এডভান্সড সায়েন্স এন্ড টেকনোলজিতে। সেখানে তিনি কাজ করেছেন দুবাইস্যাট-১ এবং দুবাইস্যাট-২ প্রকল্পে। ইউএই‌’র পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন এরপর। ২০১৬ সালে তাকে এমিরেটস সায়েন্স কাউন্সিলের প্রধান করা হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের মঙ্গল অভিযানের শুরু থেকে এর সঙ্গে জড়িত তিনি। এখন এই মিশনের বৈজ্ঞানিক দলের প্রধান। ২০১৭ সালে তাকে একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এডভান্সড সায়েন্স বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী করা হয়।

সারাহ আল-আমিরি বলেন, “আমি খুবই নার্ভাস বোধ করছি। এই অভিযানের জন্য আমরা সাড়ে ছয় বছর ধরে কাজ করেছি। মহাকাশের যে বিশালত্ব, এটিকে জানা এবং বোঝা যেরকম জটিল, সেটা আমাকে মোহিত করেছিল। এই মহাকাশযান নিয়ে আমরা পরীক্ষার পর পরীক্ষা চালিয়েছি, যাতে সব ধরণের পরিস্থিতিতে এটা টিকে থাকে। এখন আমাদের এসব কাজের ফসল এখন একটি লঞ্চপ্যাডে একটি রকেটের ওপর বসে আছে। এটি যাবে এমন এক গ্রহে, যে গ্রহটি আমাদের কাছ থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে।”

এই মহাকাশযান তৈরিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সময় লেগেছে সাড়ে ছয় বছর।

এই মহাকাশযান তৈরিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সময় লেগেছে সাড়ে ছয় বছর।

সংযুক্ত আরব আমিরাত কেন মঙ্গল অভিযান চালাচ্ছে?
সংযুক্ত আরব আমিরাতের মহাকাশ অভিযানের কোন অভিজ্ঞতাই নেই। এক্ষেত্রে তারা একেবারেই নতুন। তারা এমন এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়েছে, যেটা এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ভারত বা চীনের মতো বড় বড় দেশ নিতে পেরেছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত দেখাতে চাইছে, তাদের দেশের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এমন বড় চ্যালেঞ্জ নেয়ার ক্ষমতা তাদের আছে।

 

আরও অনেক উপসাগরীয় দেশের মতোই সংযুক্ত আরব আমিরাতও এখন তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে। তাদের লক্ষ্য একটি ভবিষ্যতমুখী জ্ঞান-নির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা। এই মহাকাশ প্রকল্প সেই লক্ষ্যেই নেয়া। তবে দেশটির যেহেতু মহাকাশ অভিযানের কোন পূর্ব-অভিজ্ঞতা নেই, তাই এই কাজে তাদের প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞরা। এভাবে মাত্র ছয় বছরের মধ্যে তারা অত্যাধুনিক একটি স্যাটেলাইট তৈরি করতে পেরেছে।

 

প্রবাস টাইম সব ধরনের আলোচনা-সমালোচনা সাদরে গ্রহণ ও উৎসাহিত করে। অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য পরিহার করুন। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

রিলেটেড নিউজ
© 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি
Design by : NooR IT
www.ashrafalisohan.com
error: Content is protected !!