শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২০, ০৯:০১ পূর্বাহ্ন

তরুণ নক্ষত্র ফাহিম সালেহ’র থ্রিলিং হত্যাকাণ্ড

নাজমুন নাহার
  • প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২০
তরুণ নক্ষত্র ফাহিম সালেহ'র থ্রিলিং হত্যাকাণ্ড

নিউইয়র্কে ফাহিম সালেহ’র এতটা অমানবিক নিষ্ঠুরতম হত্যাকান্ড থ্রিলার বইয়ের ঘটনা কিংবা হরর মুভিকেও হার মানালো। প্রাকৃতিক মৃত্যু যখন আমাদের দুয়ারে দুয়ারে হানা দিচ্ছে তখনও মানবিকতার এত অধঃপতন আজ পৃথিবীতে নেমে এসেছে! আর সেই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার আরো কত অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুভয়, তর্জন-গর্জনি, হুমকি, হিংসা-ক্রোধ, মিথ্যাচারীদের বেষ্টনী ভেঙ্গে- ভেঙ্গে আমরা একের পর এক এখনোও স্বপ্ন দেখে যাচ্ছি জীবন-মৃত্যুর গ্লানি টানতে টানতে যদি আর কটা দিন বেঁচে থাকতে পারি- অন্তত আমাদের স্বপ্নগুলোকে বাস্তব করার জন্য। কিন্তু- ?

একটা মানুষ যখন খুব অল্প বয়সে সাফল্য পায়, সে যখন অনুপ্রেরণা কিংবা ইতিবাচক আলো ছড়াতে চায় পৃথিবীতে, কিন্তু তখন তার নিজের তৈরি করা সেই সংগ্রামের আলোকিত পথের মাঝে আবার কিছু ক্ষুব্ধ, ঈর্ষাকাতর, স্বার্থান্বেষী দাঁড়িয়ে যায় তাকে ধ্বংস করার জন্য, কিংবা নিমিষেই শেষ করে দিতে চায় পৃথিবী থেকে তাকে।

ফাহিম সালেহকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে পৃথিবী থেকে, কিন্তু যারা তাকে বিদায় করে দিল এমন নিষ্ঠুর ভাবে, তারাও কি থাকবে পৃথিবীতে চিরদিন? এই পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম প্রাণী থেকে শুরু করে ক্ষমতাধর প্রাণীও একদিন নিঃশেষ হবে ধীরে ধীরে। ধন-সম্পদ, হাল-হকিকত কোন কিছুই স্থবির নয়। কারোর কোন কিছু কেড়ে নিয়ে, কাউকে নিঃশেষ করে কে’বা আজ উঠতে পেরেছে উচ্চশিখরে?

কোন মানুষ চাইলে অন্যকে ধ্বংস না করে নিজেকে তৈরি করে শূন্য থেকে পূর্ণ হতে পারে। কিন্তু আজ এই পৃথিবীর কোন কোন মানুষের হৃদয়ে নেমে এসেছে এত নিষ্ঠুর কালো ছায়া যা আগামী প্রজন্মের হৃদয়ে জন্ম দিচ্ছে হতাশা, আশঙ্কা আর ভয়। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু দেখে দেখে আমরা অগোচরে কেঁদে ফেলি, অনেকে ভুলে থাকি, কিংবা লুকিয়ে রাখি নিজেকে এইসব যন্ত্রণা থেকে। তারপর আমরা আবার জেগে উঠি নতুন স্বপ্ন নিয়ে নতুন উদ্যমে। আমাদের প্রাত্যহিক জীবন এবং বেঁচে থাকার খেলা এখন চলছে এভাবেই।

ফাহিমকে যখন এত নিষ্ঠুর ভাবে মারা হচ্ছে, তখন হয়তো কত চেষ্টাই না সে করছে সে একটু খানি বাঁচার জন্য। হয়তো বলেছে আমার সাফল্য, কৃতি, ধন-সম্পদ, ব্যবসা সবকিছু নিয়ে নে তারপরও আমাকে বাঁচতে দে। মানুষের সবকিছু শেষ হয়ে গেলেও তার মেধা কখনো শেষ হয়ে যায় না- ফাহিম হয়তো সেটা জানতো। তার মেধাটুকু সম্বল করেও নিশ্চয়ই বেঁচে থাকতে চেয়েছে। কিন্তু যারা তাকে মেরেছে তারা কি জানে একজন ফাহিমকে মেরে ফেলল পৃথিবীতে ফাহিমের মত আরো অনেক মেধাবী আবার জন্মাবে, কিংবা এখনো আছে। ধ্বংসযজ্ঞ, হত্যা, লুট আর ধোঁকা বাজদের মাঝেই সেই নক্ষত্রগুলো জ্বলে জ্বলে উঠবে!

Image may contain: one or more people and people standing

জানা গেছে, পুরোপুরি কালো পোশাক পরে একটি কালো মুখোশ পরা এই ঘাতক তার কনডো বিল্ডিংয়ের লিফট থেকে তার অ্যাপার্টমেন্টে তরুণ প্রযুক্তি উদ্যোক্তাকে অনুসরণ করেছিল। তারপরে ফাহিম সালেহকে স্থিত করতে বৈদ্যুতিক স্টানগানটি ব্যবহার করেছিলেন বলে গোয়েন্দারা বিশ্বাস করেন। আক্রমণকারী সালেহকে হত্যা করে- তাকে ছিন্ন করে এবং তার দেহকে বৈদ্যুতিক করাত দিয়ে ছড়িয়ে দেয়। নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে যে গোয়েন্দারা সালেহ’র মাথার কাছাকাছি একটি বৈদ্যুতিক করাত পেয়েছেন। অ্যাপার্টমেন্টে তাঁর মাথা ও অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পাওয়া গেছে।

** পুলিশ হত্যার জন্য কোন উদ্দেশ্য দেয়নি, তবে ডেইলি নিউজ ট্যাবলয়েড বলেছে তদন্তকারীরা বিশ্বাস করেছেন এটি কোনও ব্যবসায়িক বিরোধের কারণে হতে পারে। **

ছেলেটি যেমন মেধাবী, তেমনই একজন বড় উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু ছেলেটি বেঁচে থাকলে পৃথিবীতে আরো অনেক কিছু দিতে পারত। নতুন প্রজন্মের আবারো তাকে দেখে দেখে বের হয়ে আসতে পারতো নতুন করে স্বপ্ন দেখতে পারত আগামী প্রজন্মের মানুষগুলো। হয়তো সে একদিন হয়ে যেতে পারতো বিল গেটসের মত একজন।

ফাহিম যুক্তরাষ্ট্রের বেন্টলি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনফরমেশন সিস্টেম পড়াশোনা করতেন। নাইজেরিয়ান মোটরসাইকেলের রাইড-হিলিং ও ডেলিভারি অ্যাপ গোকদা এর সিইও ছিলেন। পেশায় ওয়েবসাইট ডেভেলপার ফাহিম অ্যাডভেঞ্চার ক্যাপিটাল গ্লোবাল নামক একটি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠানেরও উদ্যোক্তা ছিলেন। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশের পাঠাও এর একজন শেয়ার উদ্যোক্তা ছিলেন।

বাংলাদেশে পাঠাও চালু হওয়ার পর মানুষের যাতায়াত জীবন কিছুটা হলেও স্বাভাবিক হয়েছে। ফাহিম আমাদের দৈনন্দিন যাতায়াত জীবনেও অবদান রেখেছেন।

আমেরিকার ম্যানহাটানের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে কিংবা নিউ ইয়র্কের আইন শৃঙ্খলাও যার বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দিতে পারেনি, মৃত্যু ছায়া তাকে ধাওয়া করে বেড়াত সব সময়, নির্ঘাত তার এই সফলতার জন্যই তাকে অচিরেই মেরে ফেলা হয়েছে এমন নিষ্ঠুর ভাবে। তার সফলতার জন্য কতটা আক্রোশ থাকলে এতটা নিষ্ঠুরভাবে মারতে পারে ছেলেটিকে। আমার বারবার মনে হয় ছেলেটি কি টের পেয়েছে কখনো তার পিছনে এমন মৃত্যুছায়া ঘুরে বেড়ায়?

হয়তো ভেবেছে সেতো কারোর ক্ষতি করেনি, অন্যায় করেনি- সে নিজের যোগ্যতায় সাফল্য পেয়েছে। তাকে আবার কে মারতে আসবে? মানুষের সফলতার পিছনেও অস্বাভাবিক মৃত্যুছায়া ঘুর ঘুর করে তা হয়তো অনেকেরই মাথায় থাকে না, হয়তো ফাহিমেরও ছিল না। ফাহিমের হত্যাকাণ্ডের রহস্য হয়তো একদিন উদ্ঘাটিত হবে, কিংবা কখনোই হয়তো জানা যাবে না কে বা কারা তাকে হত্যা করেছে! কিন্তু আমাদের সোচ্চার হতে হবে এর সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচার হওয়ার জন্য।

আরও পড়ুনঃ দেশে এসে আটকেপড়া প্রবাসীরা ওমান ফিরতে পারবেন

ফাহিম আমাদের সকলের জন্য দুর্দান্ত অনুপ্রেরণা ছিলেন। একদিন হয়তো সে একজন পৃথিবীর নামকরা উদ্যোক্তা হতে পারতেন- তার ভেতরে সেই আলো ছিলো। এমন নিষ্ঠুর মৃত্যু আমরা চাই না পৃথিবীতে। সবাই সবার স্বপ্ন ও উচ্চাশা এগিয়ে যাক একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ার আশায়। ফাহিম আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে চিরদিন। তোমাকে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকার শ্রদ্ধা ভাই।

লেখক: নাজমুন নাহার
বাংলাদেশের পতাকাবাহী প্রথম বিশ্বজয়ী, ১৪০ দেশ ভ্রমণকারী

আরও দেখুনঃ প্রবাস টাইম নিয়ে যা বললেন ওমানের রাষ্ট্রদূত

প্রবাস টাইম সব ধরনের আলোচনা-সমালোচনা সাদরে গ্রহণ ও উৎসাহিত করে। অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য পরিহার করুন। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

রিলেটেড নিউজ
© 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি
Design by : NooR IT
www.ashrafalisohan.com
error: Content is protected !!